fbpx

মাছ মরছে তো মরছেই ? আপনার ট্যাঙ্ক সাইকেল করা কি ?

নতুন অ্যাকুরিয়াম কিনতে গেলে আমরা সবাই কি করি ? বাজারে চলে যাই। অ্যাকুরিয়াম(ট্যাঙ্ক ) কিনি, পাথর কিনি, প্লাস্টিকের  গাছ কিনি, এয়ার পাম্প কিনি,  এবং অবশ্যই বিভিন্ন দোকান ঘুরে পছন্দসই এক গাদা মাছ কিনে বাসায় চলে আসি। অ্যাকুরিয়াম সেট আপ করে মাছ ছেড়ে দেই।

এই কাজটি   সম্পূর্ণ ভুল ! দয়া করে  এই কাজ কখনোই করবেন না !

নতুন যারা হবিতে এসেছেন তারা নিশ্চয়ই এতক্ষনে চোখ কপালে তুলেছেন ভাবছেন কি বলে ? কিন্তু শুনতে অবাক লাগলেও আসলে এটাই সত্য।

নতুন ট্যাঙ্ক সেটাপের সাথে সাথেই আমাদের ট্যাঙ্ক সাইক্লিং করতে হয়। যদিও আমরা গতানুগতিকভাবে ট্যাঙ্ক সাইক্লিং বলে থাকি, আসলে ট্যাঙ্ক সাইক্লিং হল ট্যাঙ্ক এর ফিল্টারের মিডিয়া এর সাইক্লিং। ট্যাঙ্ক সাইক্লিং কি তা বুঝতে হলে প্রথমে আমাদের নাইট্রোজেন সাইকেল সম্বন্ধে একটা বেসিক ধারনা থাকা উচিৎ।

নাইট্রোজেন সাইকেল কি ? 

ট্যাঙ্কে মাছের বর্জ্য, মাছের শ্বাসক্রিয়া, মাছের না খাওয়া অতিরিক্ত খাবার, গাছের পুরনো পচা পাতা, ইত্যাদি থেকে এমনিয়া তৈরি হয়। এই এমনিয়া মাছের জন্য ক্ষতিকারক। নাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়া এই ক্ষতিকারক এমনিয়াকে ভেঙ্গে নাইট্রাইট এ রুপান্তরিত করে, যা তুলনামুলকভাবে কম ক্ষতিকারক। কিন্তু নাইট্রাইট অতিরিক্ত মাত্রায় ক্ষতিকারক। ডিনাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়া এই নাইট্রাইটকে ভেঙ্গে নাইট্রেট এ রুপান্তরিত করে। প্লান্টেড ট্যাঙ্কে কিছু নাইট্রেট গাছ শোষণ করে। বাকি নাইট্রেট পানিতে মিশে জমতে থাকে, যা আমরা নিয়মিত ওয়াটার চেঞ্জ করে কমিয়ে নাইট্রেট এর মাত্রা নিয়ন্ত্রনে রাখি। ফ্রেশ ওয়াটার ট্যাঙ্কে যদি অতিরিক্তমাত্রায় কম অক্সিজেন সমৃদ্ধ এলাকা থাকে (যেমন, লাভা রক থাকলে তার ছিদ্রের ভিতরে) সেখানে কিছু এনেরোবিক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিতে কিছু নাইট্রেট ভেঙ্গে নাইট্রোজেন গ্যাস হয়ে ট্যাঙ্ক থেকে নির্গত হয়ে যায়। কিন্তু এটা ফ্রেশ ওয়াটার ট্যাঙ্কে অতি বিরল ও নগণ্য।
তাহলে, ট্যাঙ্ক সাইক্লিং হল আসলে আমাদের ফিল্টার মিডিয়াতে যথেষ্ট পরিমান নাইট্রিফাইং ও ডিনাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর সময়, সুযোগ ও পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেন ট্যাঙ্কের ভিতরে নাইট্রোজেন সাইকেল পূর্ণ হতে পারে; অর্থাৎ যাবতীয় বর্জ্য থেকে তৈরি হওয়া এমনিয়া ভেঙ্গে নাইট্রাইট ও অতঃপর নাইট্রেট এ রুপান্তরিত হতে পারে। এখানে উল্লেখ্য, বেনেফিশিয়াল ব্যাক্টেরিয়া ফিল্টার মিডিয়াতে বাস করে, ট্যাঙ্কের পানিতে নয়।

কিভাবে সাইকেল করবেন :

প্রথম সেটআপের পরে ঠিক ফিল্টার দিয়ে ট্যাঙ্ক পানি ভরতি করে ফেলে রাখলে সাইকেল হবে না। ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর ও বংশবৃদ্ধির জন্য ব্যাক্টেরিয়ার খাদ্যের প্রয়োজন, যা হল এমনিয়া। এক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হল গোস্ট ফিডিং । এর মানে হল, আপনার ট্যাঙ্কে যত মাছ থাকবে সেই পরিমান খাবার প্রতিদিন ট্যাঙ্কে দিতে হবে। এই খাবার পচে এমনিয়া তৈরি হবে। এই এমনিয়াকে ভেঙ্গে নাইট্রাইট করার জন্য নাইট্রিফাইং ব্যাক্টেরিয়ার জন্ম হবে। তারপর সেই নাইট্রাইটকে ভেঙ্গে নাইট্রেট করার জন্য ডিনাইট্রিফাইং ব্যাক্টেরিয়ার জন্ম হবে। এক্ষেত্রে সপ্তাহে অন্তত দুইদিন ২৫% এর মত ওয়াটার চেঞ্জ করতে হবে। ওয়াটার টেস্ট কিট এক্ষেত্রে একটি অতি জরুরি জিনিস। প্রথম সপ্তাহে এমনিয়া টেস্ট করতে হবে। এমনিয়া এর পরিমান ৩-৫পিপিএম থাকতে হবে। ৩পিপিএম এর নিচে থাকলে যথেষ্ট নাইট্রিফাইং ব্যাক্টেরিয়া জন্মানোর সুযোগ পাবে না। আর ৫পিপিএম এর বেশি হলে পানি বেশি টক্সিক হয়ে যাবে। এমনিয়া টেস্ট এর রেসাল্ট দেখে খাবারের পরিমান বাড়াতে বা কমাতে হবে। দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে এমনিয়া এর সাথে নাইট্রাইট টেস্ট করতে হবে। ধিরে ধিরে এমনিয়া কমতে থাকবে এবং নাইট্রাইট বাড়তে থাকবে। তারপর এক সময় নাইট্রাইট এর পরিমাণ কমে যাবে। তখন থেকে এমনিয়া, নাইট্রাইট ও নাইট্রেট তিনটি টেস্ট ই করতে হবে। যখন এমনিয়া ০, নাইট্রাইট ০ ও নাইট্রেট <৫পিপিএম থাকবে তখন বুঝতে হবে যে ট্যাঙ্ক সাইক্লিং পূর্ণ হয়েছে। তখন আমরা ধিরে ধিরে মাছ ছাড়তে পারব। এখানে উল্লেখ্য, কখনও একসাথে বেশি মাছ ছাড়বেন না। হঠাৎ বেশি মাছ ছাড়লে আকস্মিক এমনিয়া বেড়ে যাবার কারণে আপনার ট্যাঙ্কের সাইকেল নষ্ট হয়ে যাবে এবং আবার ট্যাঙ্ক সাইক্লিং শুরু হবে। অতিরিক্ত এমনিয়া বৃদ্ধির কারণে মাছ মারাও যেতে পারে। । ধরা যাক, ট্যাঙ্কে আপনি ২০টা কার্ডিনাল টেট্রা ছাড়তে চান। প্রথমে ৫টা ছাড়ুন, তার পরের সপ্তাহে আর ৫টা, আর তার পরের সপ্তাহে বাকি ১০টা ছাড়ুন। কখনও ট্যাঙ্কের মাছের সংখ্যা যেন দ্বিগুণের বেশি না বাড়ানো হয় সেটা খেয়াল রাখবেন। আর প্রতি সপ্তাহে ওয়াটার চেঞ্জের আগে ওয়াটার টেস্ট করবেন। আপনার টার্গেট হল এমনিয়া ০, নাইট্রাইট ০ আর নাইট্রেট <৫পিপিএম রাখা। প্রয়োজনে বায়োলজিক্যাল ফিল্ট্রেশন মিডিয়া ও মাছের সংখ্যা বাড়িয়ে বা কমিয়ে ট্যাঙ্কের ভারসাম্য আনতে হবে।
সাধারণত নতুন ট্যাঙ্ক সাইকেল হতে ৪-৬ সপ্তাহের মত সময় লাগে। ট্যাঙ্ক সাইক্লিং এর ক্ষেত্রে কিছু শর্ট কাট আছে যা সাইক্লিং এর সময় কমিয়া আনবে। একটি উপায় হল অন্য ট্যাঙ্কে ব্যাবহ্রিত সাইকেল্ড ফিল্টার মিডিয়া ব্যাবহার করা। এক্ষেত্রে ফিল্টার মিডিয়া সাইকেল্ড অবস্থাতেই আছে দেখে আপনি ২-৩ দিনের মধ্যেই ট্যাঙ্কে মাছ ছাড়তে পারবেন। তারপরেও অবশ্য এই ২-৩ দিন গোস্ট ফিডিং  করে ওয়াটার টেস্ট করে নিশ্চিত হয়ে মাছ ছাড়া উচিৎ। আরেকটি উপায় হল, কোন সাইকেল্ড স্পঞ্জ ফিল্টার থাকলে তা নতুন ট্যাঙ্কএর পানিতে নিংড়ে দেয়া। ঐ ব্যাকটেরিয়াগুলো থেকেই নতুন ব্যাকটেরিয়া বংশবৃদ্ধি করবে। বাজারে “বেনেফিশিয়াল ব্যাকটেরিয়া” হিসাবে কিছু পণ্য কিনতে পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে আমার ধারণা এগুলো কোন কাজের না। ব্যাকটেরিয়া বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য ও অক্সিজেনের প্রয়োজন। আপনি নিজেই চিন্তা করুন, বোতলজাতকৃত এই ব্যাকটেরিয়া না পাচ্ছে কোন অক্সিজেন, আর না পাচ্ছে খাদ্য হিসেবে কোন এমনিয়া সোর্স। ঐ বোতলে যদি কিছু এমনিয়া থেকেও থাকে, ব্যাকটেরিয়া তা শেষ করে ফেলার পরে না খেয়ে মারা যাবে। আর বেনেফিশিয়াল ব্যাকটেরিয়া বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন ও পাচ্ছে না ঐ বোতলের ভেতরে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *